ছাত্র ভিসা: ২ শিক্ষার্থী প্রতারিত হয়ে ২২ লাখ টাকার ক্ষতিপূরণ মামলা

প্রকাশিত: ১০:৫৮ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৩, ২০২২

ছাত্র ভিসার নামে প্রতারিত হওয়া শিক্ষার্থীরা এবার ‘স্ট্রেলার কনসালটেন্ট’র ম্যানেজিং ডাইরেক্টর মুনতাসির মাহবুবের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেছেন। ক্ষতিগ্রস্ত দুই শিক্ষার্থী সিলেটের অতিরিক্ত চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পৃথক মামলা করেন। মামলা দুটিতে ২২ লাখ টাকার ক্ষতিপূরণসহ প্রতারণার বিচার চাওয়া হয়।

বাদী পক্ষের আইনজীবী প্রসেন কান্তি চক্রবর্তী মামলা দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, আদালত মামলাটি আমলে নিয়েছেন। স্টুডেন্ট ভিসার নামে ওই ব্যক্তি শিক্ষার্থীদের সুন্দর ভবিষ্যৎ ধ্বংস করেছেন। তাদেরকে ১০ বছরের জন্য ব্রিটিশ হাইকমিশন নিষিদ্ধ করে। ওই ব্যক্তি ভুয়া ‘ওয়ার্ক এক্সপেরিয়েন্স কপি’ প্রস্তুত করে দেন। যে কারণে তাদের ভবিষ্যৎ এখন অন্ধকারে। আদালতে বিষয়টি তুলে ধরে প্রতারণার বিচারসহ ক্ষতিপূরণের আবেদন করা হয়েছে।

জানা গেছে, সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার পাটকুরা গ্রামের সাজন মিয়া (৩৩) ও একই জেলার দিরাই উপজেলার হাতিয়া গ্রামের মো. আকিকুর রহমান (২৯) বাদী হয়ে গত সোমবার সিলেটের অতিরিক্ত চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দুটি দায়ের করেন। কোতোয়ালি সি.আর. মামলা নম্বর – ১১৬/২০২২ ও ১১৭/২০২২। দন্ডবিধির ১৮৮১ সনের নিগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্ট এ্যাক্ট এর ১৩৮ ধারায় মামলা দুটি করা হয়।

উভয় মামলায় সিলেট নগরীর জিন্দাবাজারের ওয়েস্ট ওয়ার্ল্ড শপিং সিটির ৫ম তলার (লিফ্টের -৪) ‘স্ট্রেলার কনসালটেন্ট’র ম্যানেজিং ডাইরেক্টর মুনতাসির মাহবুবকে (৩০) আসামি করা হয়েছে। অভিযুক্ত মুনতাসির মাহবুব রাজধানী ঢাকার মোহাম্মদপুর হাউজিংয়ের সাত মসজিদ রোডের (কনফিডেন্স টাওয়ার, বাসা নম্বর -{৫/খ(৭-ক)} এর বাসিন্দা মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমানের পুত্র। তিনি ‘স্টেলার কনসালটেন্ট’ নামের প্রতিষ্ঠান খুলে স্টুডেন্ট ভিসা প্রসেসিংয়ের ব্যবসা করেন। তার প্রতারণার শিকার হন সিলেট ও নোয়াখালী অঞ্চলের ১৯ জন মেধাবী শিক্ষার্থী।

মামলার এজাহারে বলা হয়, মুনতাসির মাহবুব স্টুডেন্ট ভিসা প্রসেসিং করেন বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করেন। বাদীকে লন্ডনের ভিসা প্রসেসিংয়ের নিশ্চয়তা প্রদান করায় তারা এতে সম্মত হন। এরপর ‘ইউনিভার্সিটি অফ দি ওয়েস্ট ইংল্যান্ড ‘-এ ভর্তি প্রসেসিং করেন। মুনতাসির নিজে আর.এম গ্রুপের ওয়ার্ক এক্সপেরিয়েন্স (অভিজ্ঞতা) কপি তৈরি করে দেবেন এবং এতে কোনো ধরনের সমস্যা হবে না বলে অঙ্গীকার করেন। যদি কোনো সমস্যা হয় তাহলে এর দায়ভার মুনতাসিরের উপর পড়বে এবং তিনি যাবতীয় ক্ষতিপূরণ প্রদানে বাধ্য থাকবেন মর্মে অঙ্গীকার করেন।

মুনতাসির মাহবুবের প্রতারণার বর্ণনা দিয়ে এজাহারে আরও বলা হয়, পরবর্তীতে বাদীসহ ১৯ শিক্ষার্থীর ডকুমেন্ট ভিএফএস কার্যালয়ে দাখিলের সময় আর.এম গ্রুপের পরিচালক সৈয়দ সাদমান চৌধুরীর স্বাক্ষরিত ওয়ার্ক এক্সপেরিয়েন্স কপি প্রস্তুত করে জমা করান। ডক্যুমেন্ট দাখিলের মাস খানেক পরে বাদীসহ ১৯ জনের ভিসা রিফিউজ (প্রত্যাখ্যাত) হয় এবং এর সাথে ১০ বছরের জন্য নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। এ ঘটনার পর শিক্ষার্থীরা ক্ষতিপূরণ দাবি করলে মুনতাসির মাহবুব ভিসা রিফিউজ ও ১০ বছরের নিষেধাজ্ঞা উত্তোলনের যাবতীয় কার্যক্রম নিজ দায়িত্বে সম্পন্ন করবেন-মর্মে আশ্বস্ত করেন।

গত ৩১ মে এ বিষয়ে একটি অঙ্গীকারনামাও সম্পাদন করেন তিনি। কিন্তু, দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও ক্ষতিপূরণ প্রদান, ভিসা রিফিউজ ও ১০ বছরের নিষেধাজ্ঞা উত্তোলনের কার্যক্রম না করায় চাপ প্রয়োগ করলে এবি ব্যাংক’র একটি চেক প্রদান করেন মুনতাসির মাহবুব। ২৮ অক্টোবর ৩ লাখ ৪৮ হাজার টাকার চেক প্রদান করা হয়। এভাবে একই দিন দুই বাদীর নামে এবি ব্যাংকের পৃথক দুটি চেক প্রদান করা হয়। ২৪ নভেম্বর চেকটি ব্যাংকে প্রত্যাখ্যাত (ডিজঅনার) হলে আইনজীবী মাধ্যমে দুই বাদী মোট ২১ লাখ ৯২ হাজার টাকার ক্ষতিপূরণ চেয়ে নোটিশ দেয়া হয়। কিন্তু, অভিযুক্ত মুনতাসির মাহবুব এতে কোনো পাত্তাই দেননি। এক পর্যায়ে প্রতারিত ১৯ শিক্ষার্থীর মধ্যে মো. সাজন মিয়া ও মো. আকিকুর রহমান আদালতে মামলা দায়ের করেন।

এদিকে,এক সাথে ১৯ শিক্ষার্থীকে নিষেধাজ্ঞার ঘটনায় শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। মুনতাসির মাহবুব শিক্ষার্থীদেরকে ভিসা পাইয়ে দিতে মার্চের প্রথম সপ্তাহে রিভিউও করেন। জুলাইয়ের শুরুতে ‘শিক্ষার্থীদের জব সার্টিফিকেটের সত্যতা নিশ্চিত হতে ব্রিটিশ হাইকমিশন থেকে সরাসরি আর.এম গ্রুপে খোঁজ নেয়া হয়। সরেজমিন গিয়ে জব সার্টিফিকেটগুলোর কোনো সত্যতা না পাওয়ায় রিভিউয়েও ১০ বছরের নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখে ব্রিটিশ হাইকমিশন’। নিয়ম অনুযায়ী, ভিসা না হলেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ফিসের জন্যে জমাকৃত পাউন্ড ফেরত পাঠায়।

কিন্তু, ওই ইউনিভার্সিটি ১৯ শিক্ষার্থীর ৫৭ হাজার পাউন্ড আর ফেরত দেবে না মর্মে জানিয়ে দেয়। জব সার্টিফিকেট জাল প্রমাণিত হওয়ার কারণে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর ৩ হাজার পাউন্ড ফেরত দেবে না বিশ্ববিদ্যালয়টি। ৩ হাজার পাউন্ড করে ১৯ জনের মোট পরিমাণ দাঁড়ায় ৫৭ হাজার পাউন্ড। প্রতারিত শিক্ষার্থীরা ভয়াবহ এই জালিয়াতির হোতা মুনতাসির মাহবুবকে পাকড়াও করতে পুলিশের শরণাপন্ন হন। গত ৪ ডিসেম্বর শনিবার কৌশলে মাহবুবের স্ত্রী ও স্ট্রেলার কনসালটেন্ট’র চেয়ারম্যান জান্নাতুল ফেরদৌস রাফাকে কোতোয়ালি থানা পুলিশের নিকট সোপর্দ করা হয়।

পরে স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস রাফার সূত্র ধরে মাহবুবকেও আটক করা সম্ভব হয়। মুনতাসির মাহবুব ও তার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস রাফার বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে কোতোয়ালি থানায় মামলা দায়েরেরও প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন প্রতারিত শিক্ষার্থীরা। এরই মধ্যে মুনতাসির মাহবুব তার স্ত্রী রাফাসহ আবারও আরেকটি অঙ্গীকারনামার কৌশল করে কোতোয়ালি থানা পুলিশের কাছ থেকে মুক্ত হয়ে যান।

এ বিষয়ে মুনতাসির মাহবুবের সাথে গতকাল মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮ টায় জানিয়েছেন, ‘শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়কে টাকা দিয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় তাদের টাকা ফেরত দিয়ে দেবে। শিক্ষার্থীদের সাথে অলরেডি আমার মীমাংসা হয়ে গেছে। তার বিরুদ্ধে সিলেটের আদালতে কোনো মামলা হয়নি’ বলে দাবি করেন মুনতাসির। সূত্র: সি. প্র.২৪